মহানায়িকার বাড়ি গিয়ে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন স্বয়ং উত্তম কুমার! জানেন উত্তরে কি বলেছিলেন তিনি?

নিজস্ব প্রতিবেদন: স্বর্ণযুগের বাংলা সিনেমা মানেই মনের গহীনে উঁকি দেয় উত্তম কুমার আর সুচিত্রা সেনের কালজয়ী রোমান্স। এ যেন এক অবিচ্ছেদ্য জুটি। নিজের অভিনয় দক্ষতা দিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই উত্তম কুমার হয়ে উঠেছিলেন বাঙালির স্বপ্নের মহানায়ক। অন্যদিকে সুচিত্রা সেনের কথা কিন্তু নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই।। সুচিত্রা সেন বাংলা চলচ্চিত্রের সেই চির সবুজ নায়িকা যার বয়স আজও কোথাও না কোথাও গিয়ে স্থির হয়ে আছে।

১৯৮০ সালের ২৪ শে জুলাই ইহলোক ত্যাগ করেন উত্তম কুমার। এর কিছু বছর পর ধীরে ধীরে লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যান সুচিত্রা সেন। জনপ্রিয়তার ব্যারোমিটারে আজও এই জুটিকে ছুঁতে পারেনি অন্য কোন নায়ক নায়িকা। তাহলে কি রহস্য ছিল উত্তম-সুচিত্রার রোমান্টিক রসায়নে? উত্তম-সুচিত্রার প্রসঙ্গ এলেই কিন্তু বাঙালি সর্বদা তাদের ব্যক্তিগত জীবনের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে রহস্যের জাল বিস্তার করে।

সত্যিই কি তাদের মধ্যে এমন কিছু ছিল? সুচিত্রা সেনের কি কখনো ভালোবাসা জন্মেছিল উত্তম কুমারের প্রতি? নাকি উত্তম কুমারের ভালোবাসা কখনো আশ্রয় খুঁজতে চেয়েছিল সুচিত্রা সেনের কাছে! প্রসঙ্গত উত্তম কুমারের মতন বহুমুখী চরিত্রে কিন্তু সুচিত্রা সেন অভিনয় করেননি।। প্রধানত রোমান্টিক চরিত্রের নায়িকা ছিলেন তিনি। ২৯ টি ছবিতে সুচিত্রা সেন উত্তম কুমারের নায়িকা হয়েছেন।

সপ্তপদী ছবিতে অভিনয় করেই বাংলা সিনেমার সর্বকালের সেরা জুটি হয়ে এগিয়ে গিয়েছেন উত্তম সুচিত্রা। এতটাই জনপ্রিয় সফল জুটি যে আজও ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’ গানটির দৃশ্যায়ন বাংলা সিনেমার সেরা রোমান্টিক দৃশ্য হিসেবে স্বীকৃত। সুচিত্রার সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে কোন এক সাক্ষাৎকারে মহানায়ক বলেছিলেন,“ রমার সঙ্গে একটা ইমোশনাল অ্যাটাচমেন্ট তো আমার চিরকাল ধরেই রয়েছে”।

অন্যদিকে সুচিত্রার বক্তব্য ছিল আমি আমার সব ব্যাপারে ওর উপরে নির্ভর করি। সবথেকে বড় ব্যাপার সুচিত্রা সেন এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন,“ আমি উত্তমের গলা ধরে চলতে পারি। এতে আমার বা ওর কোন রকমের সেন্সেশন হবে না। যেটা আমার অন্য পুরুষের সাথে হতে পারে”। এই বিষয়ে সাংবাদিক গোপালকৃষ্ণ রায় তার লেখা একটি গ্রন্থে লিখেছেন,“২৯টা ছবি একসাথে করার পর একে অপরের প্রতি অনুরাগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক

তারা গভীর রাত পর্যন্ত ফোনে কথা বলতেন। আমি সারা জীবন বহু মানুষের সাথে কাজ করেছি তবে উত্তম কুমারের মত নায়ক কিন্তু আর একটাও দেখতে পায়নি”। মহানায়িকা সুচিত্রা সেন কে নিজের অত্যন্ত কাছ থেকে দেখেছিলেন সাংবাদিক অমল সুর। তিনি তার একটি লেখনীতে লিখেছেন, মহানায়ক উত্তমকুমার একবার এসেছিলেন সুচিত্রা সেনের কাছে। তিনি তখন নানা সমস্যায় জর্জরিত। কথাপ্রসঙ্গে তিনি রমা অর্থাৎ সুচিত্রা দেবী কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন,আচ্ছা রমা আমাদের বিয়ে হলে কেমন হতো?

সুচিত্রা জবাবে বলেছিলেন,“একদিনও সেই বিয়ে টিকতো না কারণ তোমার আর আমার ব্যক্তিত্ব অত্যন্ত স্বতন্ত্র। সেখানে সংঘাত হতই। আবার তুমি চাইবে তোমার সাফল্য আমি চাইবো আমার! এরকম দুজন বিয়ে করলে কিন্তু সেই বিয়ে খুব বাজেভাবে ভেঙে যেত”।

অমল সুরের কথায় মহানায়কের একটা ভয় মিশ্রিত শ্রদ্ধা ছিল সুচিত্রা সেনের প্রতি। সুচিত্রা সেন স্পষ্টতই জানিয়েছিলেন উত্তম কুমারকে যে তোমার কোন বেচাল দেখলে কিন্তু আমি কথা বলব। তবে কখনোই সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গে তার সম্পর্ককে কেন্দ্র করে কিন্তু সুচিত্রা সেন মুখ খোলেননি। শুধুমাত্র উত্তম কুমারের স্ত্রী গৌরী দেবী আর মাকে নিয়ে তিনি চিন্তিত ছিলেন।

তবে যাই হয়ে যাক না কেন উত্তম কুমারের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক তিনি কখনোই নষ্ট করেননি। নিজের পারিবারিক সমস্যাকে উপেক্ষা করে দিনের পর দিন তিনি অভিনয় করে গিয়েছেন উত্তম কুমারের সাথে। এমন একটা অবিচ্ছেদ্য বন্ধন তারা তৈরি করেছিলেন যা দেশ ও কালের সীমানাকে ছাড়িয়ে স্পর্শ করেছে দিগন্ত কে।

কেউ হয়তো এই সম্পর্ককে নাম দিয়েছেন প্রেম, কেউ বন্ধুত্ব আবার কেউবা বলেছেন পরস্পরের প্রতি মানবিক ভালোবাসা। রাগ অভিমান দিয়ে গড়া তাদের এই সম্পর্ক ছিল যতটা ভালবাসার ঠিক ততটাই কিন্তু শ্রদ্ধার। তাই হয়তো জীবনের সায়াহ্নে এসে উত্তম কুমার এটা স্পষ্ট ভাষায় বলতে পেরেছিলেন যে কখনই সুচিত্রা সেন না থাকলে আমি উত্তম কুমার হতে পারতাম না।

Leave a Comment