আজকের গল্প- ‘সম্পর্কে মা বড় না স্ত্রী’?!

একজন মা তার ছেলেকে জন্ম দেন নাড়ী থেকে,একজন স্ত্রী সেই ছেলেকেই জন্ম দেন হৃদয় থেকে। একজন মা তার অদেখা ছেলেকে অনুভব করেন পেটে হাত রেখে দশ মাস, একজন স্ত্রী সেই অচেনা ছেলেকেই অনুভব করেন বুকে হাত রেখে সারাটাজীবন। একজন মা জন্ম দেন একজন শিশু পুত্রকে, একজন স্ত্রী জন্ম দেন একজন পরিণত পুরুষকে। একজন মা তার সন্তানকে হাত ধরে হাঁটতে শেখান, একজন স্ত্রী সেই সন্তানের হাত ধরেই জীবনের সমস্ত পথটা হাটেন। একজন মা তার সন্তানকে কথা বলতে শেখান, একজন স্ত্রী প্রিয় বন্ধু হয়ে সারাজীবন তার কথা বলার সঙ্গী হয়ে ওঠেন।

সন্তানের দায়িত্ব কাঁধে আসতেই মা তার সমস্ত পৃথিবী ভুলে যান, আবার স্ত্রী সেই সন্তানের দায়িত্ব নেবেন বলেই তার সমস্ত পৃথিবীটা ছেড়ে একদিন চলে আসেন। সন্তান না খেতে পারলে পাতের সেই উচ্ছিষ্ট খাবার মা এবং স্ত্রী উভয়েই খান, আবার সন্তান এবং স্বামীর মঙ্গল কামনায় উপবাস মা এবং স্ত্রী দুজনেই করে থাকেন।

সন্তানকে বড় করেও সন্তানের থেকে প্রতিটা মাকেই আঘাত পেতে হয়। আবার স্বামীকে বিয়ে করেও প্রত্যেকটি স্ত্রীকে এক না একদিন নির্যাতিত হতেই হয়। মায়ের কাছে সন্তানের জীবনে দায়িত্ব নেওয়ার শুরু প্রায় কুড়ি বছর। স্ত্রীর কাছে স্বামীর জীবনের দায়িত্ব নেভানোর শেষ বাকি ষাটটি বছর(কখনো কখনো সেটি আশি বছরেও যেতে পারে যদি আয়ু একশো বছর হয়)।

সন্তানের শৈশবে তার মল মুত্র মা-ই পরিস্কার করেন। সন্তান যখন বৃদ্ধ হন তখন তার এই একই দায়িত্ব স্ত্রীর কাঁধেই বর্তায়। মায়ের কোল হল সেই কোল যেখানে সন্তানের জন্ম হয় অর্থাৎ প্রথম বিছানা।
স্ত্রীর কোল হল সেই কোল যেখানে আমাদের মৃত্যু হয় অর্থাৎ শেষ বিছানা।

কিন্তু সমাজ এবং পরিস্থিতি আজ এমনই যে ছেলেটির বিয়ের পর মায়ের সাথে স্ত্রীর তুলনা করে প্রতিটা মুহূর্তে মাকেই শীর্ষস্থানে রাখেন, যেখানে দুজনের ভূমিকাই সমান সেখানে সামাজিক নজরে কেন মা আর স্ত্রীর মাঝে তুলনামূলক দ্বন্দ্বে বারবার পাঁচিল উঠবে বলতে পারেন। শুধু সমাজই নয় বড় বড় কবি সাহিত্যিকরাও এটাই বলে গেছেন যে “মা-ই বড়, স্ত্রী নয়।” তাহলে ভাবুন একবার, যে মেয়েটি নিজের পৃথিবী ছেড়ে অপরিচিত এক পৃথিবীতে পা রাখছে সে কি কখনো সেই পৃথিবীকে মন থেকে আপন করে নিতে পারবে?

মেয়েরা কখনো আমাদের মা, কখনো কন্যা কখনো বোন, কখনো স্ত্রী কখনো বা বন্ধু। মেয়েদের চরিত্রের বিশেষ দিকগুলিকে বিশেষভাবে নামাঙ্কিত আমরাই করেছি, কিন্তু লক্ষ করে দেখবেন প্রতিটা মেয়েরই একটাই নাম- সেটি হল ‘মা’। কিন্তু তফাৎ এটাই যার গর্ভে জন্মাই একমাত্র তাকেই আমরা ‘মা’ বলে চিনি। এই চেনার দৃষ্টিগত ভুলেই যত অশান্তি, যত মনমালিন্য, যত পাপ, যত ধর্ষণ, যত ইভটিসিং আরো কত কি।

গর্ভ থেকে জন্ম নেওয়াটাই মা ও স্ত্রীর মধ্যে যদি সবচেয়ে বড় পার্থক্য হয়ে থাকে তাহলে শেষ কথা একটাই বলব-“একজন আপনাকে গর্ভে ধারণ করেছেন, অন্যজন আপনার জন্য গর্ভধারণ করবেন।” “একজন আপনাকে জন্ম দিয়ে মা হয়েছেন, অন্যজন আপনার জন্য আরেক জনকে জন্ম দিয়ে মা হবেন।”

শ্রীরামকৃষ্ণ নিজের স্ত্রীকে শুধু ‘মা’ ভাবতেনই না, ‘মা’ ডাকতেনও। তাই দুজন মা কখনোই আলাদা না একটাই, কারণ পৃথিবীতে একমাত্র ‘মা’ শব্দটাই আমরা প্রথম বলতে শিখি, তাই মায়ের বিপরীত শব্দ ‘স্ত্রী’ কখনো হয়না, দুজনেই মা, আর দুজন মা-ই আপনার, শুধু আপনার।
(লেখা – Pritam Guha)

Back to top button