শেষজীবনে তালাবন্দী করে রেখে যেতো মেয়ে! জোটেনি একটা হারমোনিয়ামও, মান্না দে’র এই করুণ পরিণতি চোখে আনবে জল

নিজস্ব প্রতিবেদন: স্বর্ণযুগের কিংবদন্তি শিল্পীদের কথা বলতে গেলে আমরা কিন্তু গায়ক মান্না দে’র নাম প্রথমেই নিতে পারি। একটা সময় বাংলা আর হিন্দি মিশিয়ে আমাদেরকে একের পর এক অসাধারণ গান উপহার দিয়েছেন এই প্রবাদপ্রতিম শিল্পী। তবে অনেকেই হয়তো জানেন না এই শিল্পীর জীবনের শেষ দিনগুলি কিন্তু অত্যন্ত কষ্টের মধ্যে দিয়ে কেটে গিয়েছে।

মান্না দের জীবনের এই করুণ পরিণতির কথা আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা আলোচনা করতে চলেছি। নিঃসন্দেহে বলতে পারি এই প্রতিবেদনটি পড়ার পরে আপনাদের চোখে জল আসতে বাধ্য হবে। সম্প্রতি একটি নামী সংবাদমাধ্যমে শিল্পীর জীবনের এই অজানা দিক প্রকাশ্যে এসেছে। যা জানার পর রীতিমত অবাক হয়ে গিয়েছেন নেটিজেনদের একাংশ।

শোনা যায়, মুম্বই ছেড়ে চলে যাওয়ার আগে মান্না দে জানিয়েছিলেন ছোট মেয়ে সুমিতা বেঙ্গালুরুতে কিছু কাজ করতে চান বলে তিনিও সেখানে চলে যাচ্ছেন। এরপর থেকে তাঁর সঙ্গে অনেক চেষ্টা করেও যোগাযোগ করতে পারেননি আর এক নামী গায়িকা আরতি মুখোপাধ্যায়। জানা যায়, ফোন বেজে গেলেও ধরতেন না কেউ।একবার জনপ্রিয় একজন ব্যক্তি মান্না দে’র জন্মদিনে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু অবস্থা এমনই ছিল যে বাড়িতে ঢুকতে পারেননি তিনি। যে মান্না দে ভোরবেলা উঠে নিয়মিত রেওয়াজ করতেন, শেষ জীবনে তিনিই পাননি একটি হারমোনিয়াম। ভাবুন তো একজন শিল্পীর জন্য এটা কতটা পরিমাণ বেদনাদায়ক হতে পারে!

এরপর আপনাদের যে ঘটনাটি বলব তা হয়তো শোনার পর বাকরুদ্ধ হয়ে যেতে পারেন।মান্না দের বহু গানের মিউজিক অ্যারেঞ্জার হিসেবে কাজ করেছিলেন শান্তনু বসু। স্ত্রী সুলোচনার মৃত্যুর পরে মান্না দে একদিন ফোন করলেন তাকে। স্ত্রীকে উৎসর্গ করে কয়েকটি গান করার কথা জানালেন। সেই সময় মান্না দে বলেন ,“এখন তো আমার গান আর কেউ পয়সা খরচ করে করবে না তুমি আমাকে বলো আমি যদি আটটা গান করি তাহলে কত খরচ হতে পারে”?

যদিও মান্নাদের কথা শুনে শেষ পর্যন্ত মহুয়া লাহিড়ী এগিয়ে এসেছিলেন তার গান রেকর্ড করার উদ্দেশ্যে। এই রেকর্ডের কাজেই সান্তনু বসু ব্যাঙ্গালোর পৌঁছে ফোন করেন মান্না দে কে। জিজ্ঞেস করেন কখন আসবেন তিনি? একটু ইতস্তত করেই কিংবদন্তি শিল্পী মান্না দে এখন ছোট মেয়ে কাজে বেরিয়ে যাবেন তাই পরের দিন আসতেন।

একথা শোনার পর শান্তনু বলেছিলেন, আর কাউকে লাগবে না। যা শুনেই মান্না দে বলেন, কিছু অসুবিধা আছে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে গায়ক নিজেই বলেন, মেয়ে তাঁকে তালা বন্ধ করে কাজে চলে যান। যা শুনে চমকে উঠে শান্তনু বলেন, ‘দাদা এভাবে?’ আর তা শুনে আক্ষেপ করে গায়ক বলেন, জীবনটা একেবারে শেষ হয়ে গেল। তাঁর মধ্যে বাঁচার আর কোনও ইচ্ছেই নেই। আর একথা বলেই হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেন তিনি।

যদিও পরে তার কন্যার বক্তব্য জানতে পারা যায়। ব্যাঙ্গালোরে একটি আইটি সেক্টরে মান্না দের কন্যা এবং তার স্বামী একটি ফাস্টফুড সেন্টার চালাতেন। যা শুরু হতো সন্ধ্যা ছটা থেকে এবং শেষ হতে হতে প্রায় গভীর রাত হয়ে যেত। যার ফলস্বরূপ শেষ রাতে এসে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়তেন তারা। অন্যদিকে মান্না দের দিন শুরু হতো ভোর পাঁচটা থেকে। তার বড় মেয়ে বহু সময় পর্যন্ত আমেরিকাতেই সেটেল্ড।

স্ত্রীর মৃত্যুর পর তাই মান্না দের সমস্ত দায়িত্ব গিয়ে পড়েছিল ছোট মেয়ের উপরে। তবে শিল্পীর জীবনের এই শেষ কয়েকদিনের ঘটনার কথা শুনে রীতিমতো আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন তার অনুরাগীরা। এরকম একজন কিংবদন্তি শিল্পীর জীবনের শেষ দিনগুলিও যে এতটা কষ্টের হতে পারে তা হয়তো অনেকেরই ধারণার বাইরে। ইনি সেই মান্না দে যিনি নিজের সারাটা জীবন উৎসর্গ করে দিয়েছেন গানের জন্য।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য ১৯১৯ সালের ১ মে মান্না দে জন্মগ্রহণ করেছিলেন কলকাতায়। প্রথমে তাঁর কাকা কৃষ্ণচন্দ্র দে ও পরে ওস্তাদ দাবির খাঁ, উস্তাদ আমান আলি খান এবং উস্তাদ আব্দুল রহমান খানের কাছ থেকে গান শিখেছিলেন তিনি। এরপরে মুম্বই পাড়ি দিয়ে শচিন দেব বর্মণের অধীনে সহকারী পরিচালক হিসাবে কাজ করেন। এরপর কেরিয়ার শুরু হয় তার। মান্না দে তাঁর শাস্ত্রীয় জ্ঞান এবং কণ্ঠের জাদুতে সকলের মন জয় করেছেন।

ভারত সরকার তাঁকে ১৯৭১ সালে পদ্মশ্রী, ২০০৫ সালে পদ্মবিভূষণ এবং ২০০৯ সালে দাদাসাহেব ফালকে সম্মান দিয়েছে৷ আবার ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁকে রাজ্যের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ‘বঙ্গবিভূষ’-ও প্রদান করেছে। এছাড়া ‘দাদাসাহেব ফালকে’ পুরস্কার থেকে শুরু করে কী নেই তাঁর ঝুলিতে। তবে আপনারা হয়তো জানতে পেরে অবাক হবেন যে তার আসল নাম কিন্তু মান্না দে নয়।মান্না দে-র আসল নাম প্রবোধ চন্দ্র দে এবং ডাক নাম ‘মানা’। আর সেই থেকেই তিনি হয়ে উঠে ছিলেন মান্না।

Back to top button