যে মহালয়া শুনে ভাঙচুর হয়েছিল আকাশবাণীর অফিস, আদতে কেমন ছিল উত্তম কুমারের কণ্ঠে সেই দুর্গতিহারিণীম্ মহালয়া? রইলো ভিডিও!

নিজস্ব প্রতিবেদন:- আজ আমরা ফিরে যাবো ১৯৭৬ সালে। সেই সময় এমার্জেন্সি চলছে গোটা ভারত জুড়ে। আচমকাই দিল্লিতে বসে আকাশবাণীর কর্তারা ঠিক করলেন দীর্ঘ সময় ধরে রেডিওতে সম্প্রচারিত মহিষাসুরমর্দিনী বন্ধ করে দেওয়া হবে। তার পরিবর্তে মহালয়ায় নতুন অনুষ্ঠান হবে নতুন সংগীতের আয়োজনে। এই অনুষ্ঠান করা হবে স্টার কোন ভয়েস নিয়ে। বাঙালির কাছে তখন সবচেয়ে বড় স্টার ছিলেন মহানায়ক উত্তম কুমার। আকাশবাণীর কর্মকর্তারা তার কাছে এই নতুন অনুষ্ঠান পাঠের জন্য প্রস্তাব নিয়ে এলেন।

কিন্তু তিনি রাজি হতে চাননি। হাজার হলেও তিনি বাঙালি তো। মহালয়ার আবেগ সম্পর্কে তার স্পষ্টতই ধ্যান-ধারণা ছিল। একটু চিন্তা ভাবনা করে তিনি চলে গেলেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কাছে। যিনি ১৯৩১ সাল থেকে টানা মহিষাসুরমর্দিনী তথা চণ্ডীপাঠ করে গিয়েছেন আকাশবাণীতে। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ বাবু অভয় দিলে শেষ পর্যন্ত রাজি হয়ে গেলেন মহানায়ক। ফলাও করে প্রচার চালানো হলো মহালয়ার সকালে নতুন অনুষ্ঠান আসছে, তাতে কন্ঠ দেবেন মহানায়ক উত্তম কুমার। অনুষ্ঠানের নাম ‘দেবী দুর্গতিহারিনী’।

কয়েকদিন প্রচার করার পরে সাধারণ জনগণের মধ্যে একটা আগ্রহ তৈরি হলো। সেবার অর্থাৎ ১৯৭৬ সালের মহালয়া সকালে বাঙালির ঘুম ভাঙলো মহান মহানায়কের কন্ঠে মন্ত্র পাঠ শুনে। যদিও তারপর যে ঘটনাটা ঘটেছিল সেটা হয়তো স্বয়ং উত্তম কুমার বা আকাশবাণী কর্তৃপক্ষ স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেননি। আকাশবাণীর অফিসে রীতিমতো খোলা চিঠি আর অভিযোগের মেলা বসলো। এমনকি বহু মানুষ আকাশবানী কর্তৃপক্ষকে গাল দিতে ও ছাড়েননি।

শেষ পর্যন্ত অবস্থা বেগতিক দেখে তারা বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কন্ঠে মহালয়ার রেকর্ড পুনরায় চালাতে বাধ্য হন। সত্যি কথা বলতে উত্তম কুমার কিন্তু খারাপ পারফরম্যান্স দেননি। আসলে বাঙালি সব নতুন জিনিস মেনে নিতে পারে না। দিল্লিতে বসে থাকা আকাশবানীর কর্তারা বাঙালির সেই সেন্টিমেন্ট ধরতে পারেন নি। যার ফল ভোগ করতে হয়েছিল উত্তম কুমারকে। বাঙালি মহানায়কের কন্ঠে চন্ডী পাঠ শুনলেও তার মধ্যে কিন্তু কোন পুজোর আমেজ খুঁজে পায়নি।

নিজের সমস্ত চেষ্টা দিয়েই কিন্তু তিনি অনুষ্ঠানটি রেকর্ড করেছিলেন বলা যায়। ১৯৭৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর, দিনটি ছিল রবিবার অর্থাৎ ছুটির দিন। এইদিন মহালয়ার “দেবীং দূর্গতিহারিণীং” অনুষ্ঠানটির গ্রন্থনা রেকর্ড করার জন্য এসেছিলেন উত্তমকুমার। একেবারে সেই কণ্ঠস্বর। চোখ বুঝলে যেন সিনেমা দেখছে সকলে উত্তমকুমারের। উত্তমকুমারের কাছে ‘দেবীং দূর্গতিহারিণীং’ সম্পর্কে মতামত জানতে চাইলে,
উত্তমকুমার বলেছিলেন— “ঠাকুর ঘরকে রোনোভেট করে ড্রইংরুম বানালে যা হয়, তাই হয়েছে”।

তবে বাঙালি যে তার অনুষ্ঠান উপভোগ করতে পারবেন না সেটা হয়তো তিনিও আন্দাজ করেছিলেন । তাইতো অনুষ্ঠান করার জন্য হ্যাঁ বলার আগে তিনি ছুটে গিয়েছিলেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রর কাছে। হয়তো সেই মানুষটার কাছ থেকে এই উত্তম কুমার সাহস নিতে চেয়েছিলেন। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র কিন্তু তাকে ফিরিয়ে দেননি। নিজে কখনো আকাশবাণীর কাছ থেকে যোগ্য সম্মান না পেলেও তার কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত কিন্তু হাসিমুখেই গ্রহণ করে উত্তম কুমারকে অভয় দিয়েছিলেন।

তবে হয়তো কোথাও না কোথাও বাঙালির সেন্টিমেন্ট হেরে গিয়েছিল মহানায়কের কাছে। আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনটি সম্পর্কে আপনাদের কোন মতামত থাকলে অবশ্যই কিন্তু তা আমাদের কমেন্ট সেকশনে শেয়ার করে নেওয়ার অনুরোধ রইল। উল্লেখ্য এই প্রতিবেদনের সঙ্গে উত্তম কুমারের সেই ‘দেবীং দূর্গতিহারিণীং’ এর ভিডিও লিংক যুক্ত করে দেওয়া হল। চাইলে আপনারাও শুনে নিতে পারেন মহানায়কের কন্ঠে এই অনুষ্ঠানটি।

Back to top button